হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা:) এর জীবনী


نَحْمَدُهُ وَنُصَلَّى عَلَى رَسُولِهِ الْكَرِيمِ - أَمَّا بَعْدُ فَأَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللهَ مَعَنَا وَقَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ

وَسَلَّمَ أَفْضَلُ هَذِهِ الْأُمَّةِ بَعْدَ نَبِتِهَا أَبُو بَكْرٍ أَوْ كَمَا قَالَ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ

 

আজকের এই মহতি জলসার সম্মানিত সভাপতি, বিজ্ঞ বিচারক মণ্ডলী, সুদক্ষ পরিচালক ও হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) এর আদর্শে উজ্জীবিত সংগ্রামী ভাই ও বন্ধুরা! আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে যখন সারা দুনিয়া পাপাচার, অনাচার, অন্যায় অবিচার, জুলুম-নির্যাতনে ভরে গিয়েছিল। মানুষের মাঝে ছিল না কোন মানবতা, ছিলো না কোন ধর্ম, ছিলো না সামান্যতমও মায়া- মমতা। নিষ্পাপ, নির্দোষ শিশু ও মানুষ হত্যা করা ছিলো তাদের সাধারণ ব্যাপার। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, যিনা-ব্যভিচার ছিলো তাদের পেশা । মদ, শুকুর, কুকুর ও মৃত জন্তু ছিলো তাদের খাবার। সুদ, ঘুষ, জুয়া ছিলো নিত্যদিনের সঙ্গী। মোটকথা শয়তানের শয়তানীতে পৃথিবীর প্রতিটি কোন, অলি-গলি, আনাচ-কানাচ পর্যন্ত কলুষিত হয়ে পড়েছিল। তখন সমগ্র পৃথিবী পাপের তাড়নায় অধীর হয়ে একজন ত্রাণকর্তার অপেক্ষায় কাতর নয়নে চাতক পাখির মতো স্বর্গাভিমুখে তাকিয়ে ছিলো। ঠিক সে সময় বিশ্বমানবতাকে হেদায়েতের পথ দেখাতে হেদায়েতের মশাল নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। শুরু করলেন পশুতুল্য মানুষগুলোকে সোনার মানুষে রূপান্তরিত করার মিশন। তাই শুরুতেই আহ্বান করলেন মূর্তিপূজা ছেড়ে দিয়ে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে একেবারে শুরুর দিকে যারা মুসলমান হয়ে ধন্য হয়েছিলেন। যাদেরকে বক্ষে ধারণ করে পৃথিবী আজো গর্বিত । যাদের বদৌলতে আমরা পেয়েছি ইসলামের মত মহামূল্যবান সম্পদ । তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আজকের আলোচ্য ব্যক্তিত্ব আমীরুল মু'মিনীন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)।

 

প্রিয় সুধী!

হযরত আবু বকর (রা.) দ্বীনের প্রতি দরদ, ভালোবাসা, নিঃস্বার্থকতা, যোগ্যতা, সাহসিকতা, আর নবী প্রেমে ছিলেন অদ্বিতীয় । তাইতো হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে- এ রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পর উম্মতের মাঝে সর্বোত্তম হযরত আবু বকর । অন্যত্র এরশাদ হয়েছে- أفْضَلُ هُذِهِ الْأُمَّةِ بَعْدَ نَبِيهَا أَبُو بَكْرٍ আবু বকর জান্নাতী ।

 

প্রিয় সুধী!

এই মহামানব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্মের ২ বছর পর ৫৭৩ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তার আসল নাম আব্দুল্লাহ, উপনাম আবু বকর, উপাধী সিদ্দীক ও আতীক । পিতার নাম উসমান, মাতার নাম সালমা । গোত্রের দিক থেকে তাকে আত-তামীমী আর বংশের দিক থেকে তাকে কুরাইশী বলা হত। ষষ্ঠ পুরুষ মুররা পর্যন্ত গিয়ে তার বংশপরম্পরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বংশের সাথে মিলে যায় ।

বন্ধুগণ! ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আবু বকর (রা.) ছিলেন সচ্চরিত্র, দায়িত্ববোধ ও বিশ্বস্ততায় সমাজের অনন্য এক মূর্তপ্রতীক। তিনি বর্বর যুগের সকল অন্যায়, অশ্লীল কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন । ইসলাম গ্রহণের পূর্বেই নিজের জন্য মদকে হারাম করে নিয়েছিলেন। তিনি তখনও সততার গুণে গুণান্বিত ছিলেন। বিধায় জাহিলিয়াত যুগে রক্তপণের মাল তারই নিকট জমা রাখা হতো । সামাজিক বিচার আচারও তার কাছেই আসতো। মানুষ নির্দ্বিধায় তার ফয়সালা মেনে নিত । এভাবেই আবু বকর (রা:) মানুষের একান্ত আস্তাভাজনে পরিণত হন।

 

প্রিয় উপস্থিতি!

হযরত আবু বকর (রা:) প্রথম থেকেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি দুর্বল ছিলেন । তাইতো দেখা যায় তার কাছে ইসলামের দাওয়াত দেয়া মাত্রই স্বাধীন পুরুষদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর ব্যাপারে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : আমি যারই নিকট ইসলামের দাওয়াত দিয়েছি। তার নিকট থেকে কিছু না কিছু সংকোচ অনুভব করেছি । কিন্তু আবু বকর বিন্দু পরিমাণও সংকোচ করেনি। প্রিয় সুধী! আবু বকর (রা.) এর ঈমানের শক্তির অবস্থা এই ছিল যে, কোন অবস্থাতেই তাতে দুর্বলতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো না। তাইতো আমরা দেখতে পাই মেরাজের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মক্কার কাফেররা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মিথ্যাবাদী, ধোকাবাজ ও পাগল ইত্যাদি বলে গালি দিচ্ছিল। ঠিক তখনও হযরত আবু বকর (রা.) বলেছিলেন তিনি যদি এর থেকেও কঠিন এবং আশ্চর্য রকম কথাও বলেন আমি দ্বিধাহীন চিত্তে তাও মেনে নিতে এবং মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতে প্রস্তুত আছি। তার এরূপ দৃঢ় ঈমানের কারণে নবুওয়াত দরবার থেকে তাকে সিদ্দীক উপাধী দান করা হয় ।

 

প্রিয় সুধীমণ্ডলী!

হযরত আবু বকর (রা:) ইসলাম গ্রহণের পর অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ইসলামকে আকড়ে ধরেছিলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মনে-প্রাণে ভালোবেসেছিলেন। যার জ্বলন্ত প্রমাণ হলো- যখন আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন আয়াত নাযিল করলেন-আপনার উপর আসমান থেকে যে সমস্ত নির্দেশ আসছে তা আপনি প্রকাশ্যে প্রচার করুন আর মুশরিকদের থেকে পৃথক থাকুন। এ নির্দেশ পেয়ে যখন হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদের নিকট প্রকাশ্যে তাওহীদের বাণী প্রচার করার ইচ্ছা করলেন। তখন হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে কাফেরদের অত্যাচার থেকে রক্ষা করার জন্য হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অনুমতি নিয়ে তিনি নিজে ঐ কুরাইদের নিকট গেলেন এবং কাবাচত্বরে তাওহীদের বাণী প্রচার করলেন । তৎক্ষণাৎ কুরাইশের কাফেররা তার উপর আক্রমণ করল এবং অত্যন্ত নির্দয়ভাবে তাকে মারধোর করল। কিন্তু তিনি হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভালোবাসায় ঐ কাফেরদের সকল অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করলেন । কিন্তু এক পর্যায়ে মারাত্মক আঘাতে তার শরীর রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেল। তিনি বেহুশ হয়ে পড়ে গেলেন কাবা চত্বরে । তার রক্তে লেখা হলো কাবা ঘরে প্রথমবারের মত ইসলাম প্রচারের ইতিহাস। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তাকে বাড়ি নেওয়া হলে, তিনি সারাদিন পর যখন সন্ধ্যায় জ্ঞান ফিরে পান, তখন তার প্রথম প্রশ্ন ছিলো : রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেমন আছেন? শত চেষ্টা করেও তাঁর মা তাঁকে কিছু খাওয়াতে পারেননি। একটি কথায় তিনি বলছিলেন, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে চোখে না দেখা পর্যন্ত কিছু খাব না। সেই অসুস্থ শরীর নিয়েই রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে হাজির হয়ে প্রশান্তি লাভ করলেন ।

 

প্রিয় সুধী!

একেই বলে নবীর প্রতি ভালোবাসা । একেই বলে আশেকে রাসূল। আর বর্তমান সমাজে কিছু ও আশেকে রাসূল দেখা যায়। যাদের মাথায় টুপি নেই, মুখে দাঁড়ি নেই, শরীরে পাঞ্জাবি নেই । ১২ই রবিউল আউয়াল আসলে মিষ্টি নিয়ে টানাটানির শেষ নেই। খোদার কসম আবু বকর (রা.) তো সেই ব্যক্তি যিনি তাবুক যুদ্ধে নিজের সমস্ত কিছু ইসলামের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। আবু বকর তো সেই ব্যক্তি যিনি রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইলি ওয়াসাল্লাম) যামানার সর্বশেষ যুদ্ধ তাবুকের ময়দানে ইসলামের ঝাণ্ডাবাহী ছিলেন । আবু বকর (রা.) তো সেই ব্যক্তি যিনি রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইন্তেকালের সময় শান্ত ও ধৈর্য্যশীল থেকে দিশেহারা উম্মতকে সঠিক পথের দিশা দিয়েছিলেন।

আবু বকর (রা.) তো সেই ব্যক্তি যার সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন আমি দুনিয়াতেই সকলের এহসানের বিনিময় দিয়ে দিয়েছি। কিন্তু আবু বকরের এহসানের বদলা দিবেন আল্লাহ তাআলা ।

আবু বকর (রা.) তো সেই মহান ব্যক্তি যিনি ইসলাম ও মুসলমানদের বিপদে সিদ্দীকি চেতনায় ঝাঁপিয়ে পড়তেন । আবু বকর (রা.) তো সেই ব্যক্তি যিনি ২ বছর তিন মাস ১০ দিন খেলাফতের দায়িত্ব পালন করে ১৩ হিজরী সনের ২১ শে জুমাদাল উখরার বিকালে ৬৩ বছর বয়সে এন্তেকাল করে প্রিয় বন্ধুর পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হন ।

 

সংগ্রামী ভাই ও বন্ধুগণ!

অত্যন্ত পরিতাপের সাথে বলতে হয়, আজ সেই মুসাইলামাতুল কাজ্জাবের অনুসারীরা এদেশের মুসলমানদের ঈমান আকীদা হরণ করে চলেছে । খৃষ্টান মিশনারীরা সরলমনা মুসলমানদেরকে ধর্মান্তরিত করে চলেছে। নাস্তিক মুরতাদরা আমার নবীকে গালি দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে এক জঘন্যতম ইতিহাস রচনা করেছে । ইসলামের বিরুদ্ধে আরও কত ষড়যন্ত্র চলছে। আজ কোথায় সেই সিদ্দিকী চেতনায় উজ্জীবিত নবীর সৈনিকেরা? আজ বসে থাকলে চলবে না বরং ইসলাম বিদ্বেষী ঐ সকল নাস্তিক মুরতাদদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে হবে। রুখে দিতে হবে ওদের সকল অপশক্তি। ভেঙ্গে দিতে হবে ওদের সকল আস্তানা । সমুন্নত রাখতে হবে বিশ্বনবীর ইজ্জত। উড্ডিন করতে হবে ইসলামের হেলালী নিশান । তাহলেই সার্থক হবে আজকের বক্তৃতা অনুষ্ঠান । আল্লাহ আমাদের সকলকে তৌফিক দান করুন  আমীন 

وَاخِرُ دَعْوَانَا اَنِ الْحَمْدُ لِه رَبِّ الْعَالَمِينَ

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url